” মুসলিম শাসকের বাংলা সনে ‘ শ্রী’ বৃদ্ধি “
–ইবনে শাহ
বাংলা সনের উৎপত্তির সাথে এদেশের মুসলিম শাসকদের অবদান ওৎপ্রতভাবে জড়িয়ে আছে। । মুঘল সম্রাট আকবর ১৬’শ শতাব্দীতে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। এর আগে হিজরি চান্দ্রবর্ষ অনুসারে খাজনা আদায় করা হতো, যা কৃষিকাজের সঙ্গে অমিল হয়ে যেত। কারণ হিজরি বছর চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা সৌর বছরের তুলনায় প্রায় ১১ দিন কম হওয়ায় সৌর বছরের সাথে গণনায় প্রতিবছর এগিয়ে আসতো। ফলে হিজরী সন কৃষকরা ফসল তোলার আগেই শুরু হয়ে যেত এভাবে খাজনা দেওয়া কৃষকের অত্যন্ত কষ্টকর ছিল।
এই সমস্যার সমাধানের জন্য সম্রাট আকবর একটি নতুন বর্ষপঞ্জি চালু করেন, যা সৌর বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এটি “ফসলি সন” নামেও পরিচিত ছিল যা পরবর্তীতে বাংলা সন হিসেবে প্রচলিত হয়। এই নতুন বর্ষপঞ্জির হিজরি সনের মতো এগিয়ে আসে না, ফলে কৃষকদের সুবিধা হয় এভাবেই বাংলা সন কৃষি ও রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে খাজনা আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলা মাসগুলোর নাম মূলত নক্ষত্রের নাম থেকে এসেছে এবং এগুলো প্রকৃতি, ঋতু ও আকাশের পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ থেকে বুঝা যায় এই উপমহাদেশে মুসলিম শাসনামলে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিদ্যা কত উন্নত পর্যায় ছিল। মুঘল সালতানাতের বিভিন্ন অঞ্চলেও “ফসলি সন” ব্যবহার করা হতো। এটি ছিল কৃষি ও রাজস্ব নির্ভর একটি সৌরবর্ষ, যা স্থানভেদে কিছুটা ভিন্ন রূপ নেয়। শুবে বাংলা, উত্তর ভারত, দাক্ষিণাত্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলা সনের ব্যবহার দেখা যায়। মুসলিম শাসকেরা এ উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভেদে আরো কিছু “ফসলি সন” এর আঞ্চলিক পঞ্জিকার প্রচলন করেছিলেন যেমন–
তামিলনাড়ুতে —- তামিল সন
মহারাষ্ট্রে ———শকাব্দ
কেরালাতে ———মালয়ালম কলেন্ডার
এসব বর্ষপঞ্জি স্থানীয় সংস্কৃতি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। মুসলিম শাসকদের এই উদ্যোগ কেবল প্রশাসনিক সুবিধার জন্যই নয়, বরং সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলা অঞ্চলে নববর্ষের দিনে খাজনা পরিশোধের পর জমিদাররা প্রজাদের আপ্যায়ন করতেন, যা “হালখাতা” নামে পরিচিত। এই হালখাতার প্রচলনও মুসলিম শাসনামল থেকেই শুরু হয়। ইসলাম ধর্মের রীতিনীতি অনুযায়ী যেকোনো ধরনের লেনদেন লিখে রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। সে অনুযায়ী শুধু জমিদারের খাজনা, ব্যবসা-বাণিজ্যে বাকি বকেয়া লিখে রাখা হতো না, ভূসম্পত্তির মালিকানাও লিখে রাখা হতো। এভাবেই ব্যবসা বাণিজ্যে যেমন হালখাতা শুরু হয় ঠিক তেমনি ভাবে মুসলিম শাসনামল থেকে এদেশে জমির মালিকানা নির্ধারণে দলিল এবং পাট্টার প্রচলন শুরু হয়। যার সুফল আজও সমগ্র উপমহাদেশবাসী ভোগ করছে।
মুসলিমদের বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান যেমন মঙ্গল শোভাযাত্রার নামে দেবদেবীর প্রতিকৃতি ও বিভিন্ন প্রাণীর মুখোশ নিয়ে ধুঁতি পড়ে মাথায় চন্দনের তিলক, পূজা মণ্ডপের সকল বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে রাজপথ প্রদক্ষণ, গ্রামীণ মেলায় অশ্লীল নাচ গান, পান্তা-ইলিশ খাওয়া ইত্যাদি শুরু কিভাবে হলো। এর ইতিহাস অনেক করুন। বাংলার সর্বশেষ স্বাধীন নবাব ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধে ১৭৫৭ সালে পলাশী, ১৭৬৩ সালে “উধুয়ানালা” (উদয়নালা) ও ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে (বক্সারের যুদ্ধ) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে লড়াই করে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন, এরপর থেকে বাংলায় মুসলিম শাসনের অবসান হয়।
দখলদার ইংরেজদের বিরুদ্ধে এদেশের মুসলিমরা শতবর্ষব্যাপী লড়াই সংগ্রাম অব্যাহত রাখে। কিন্তু এ দেশের স্বাধীনতার ঐ সব আন্দোলনে সুবিধাভোগী দালাল সম্প্রদায়ের অসহযোগিতা, পক্ষান্তরে ইংরেজদেরকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাহায্য সহযোগিতা প্রদানের কারণে ইংরেজদেরকে এদেশ থেকে বিতারিত করা সম্ভব হয় না। এমনকি ১৮৫৭ সালের ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিপাহী মহাবিপ্লব সংঘটিত হলেও এ দেশের বর্ণ হিন্দু সম্প্রদায় ইংরেজদের পক্ষ অবলম্বন করে। কিছু নিম্ন বর্ণের হিন্দু সিপাহী ও একমাত্র “ঝাসির” রানী লক্ষ্মীবাঈ সিপাহী বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে । ফলে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব সফল হয় না। ১৮৫৭ সিপাহী বিপ্লবে পরাজয়ের পর উপমহাদেশের সকল মুসলিম শাসকের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটিশ আধিপত্যবাদী শাসন কায়েম করে। এরপর থেকে শুরু হয় হাজার বছরব্যাপী এদেশের মুসলিম শাসনের সোনালী অধ্যায়ের ইতিহাস বিকৃতকরণ এবং ইসলামী কৃষ্টি কালচার ধ্বংসের অভিযান।
বিংশ শতকের বিশিষ্ট মুসলিম সাহিত্যিক সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী তার লেখায় উল্লেখ করেন ব্রিটিশ শাসক কর্তৃক “বঙ্গভঙ্গ” অধ্যাদেশ ঘোষণার পর থেকে হিন্দু মুসলিম অসন্তোষ প্রকাশ্য রূপ ধারণ করে। পূর্ব বাংলায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় শহরে বন্দরে পাড়ায় মহল্লায়”অনুশীলন সমিতি” নামক শরীরচর্চা কেন্দ্র স্থাপন করে শুধু হিন্দু যুবকদেরকে ব্যায়াম, কুস্তি ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতে থাকে। অন্যদিকে মুসলিমদের দৈন্য অবস্থা ও অসংগঠিত, একদিকে ব্রিটিশ শাসন অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের দাঙ্গাবাজ রূপ। মুসলিম নেতৃবৃন্দ তখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে কৌশল করে মহরম মাসের কারবালার শোকাবহ ঘটনার অনুরূপ ধারণ করে এক মাসব্যাপী শারীরিক প্রশিক্ষণ তথা ঘোড়দৌড়, লাঠি, বল্লম,তরবারি তীরধনুক খেলা ও প্রতিযোগিতার প্রচলন করে। মুসলিম শাসকের প্রবর্তিত বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে স্থানে স্থানে মেলা বসিয়ে সে সকল মেলায় লোকজ শিল্পের পণ্য ক্রয়বিক্রয় ও জারি গানের আসরের সাথে অনুরূপ প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। উদ্দেশ্য ছিল মহরমের শোকাবহ মাস ও নববর্ষের মেলার আড়ালে আত্মরক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া।
কিন্তু বিংশ শতকের শুরু থেকে বাংলা নববর্ষের লোকজ শিল্পের মেলাগুলোতে বর্ণহিন্দু জমিদারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পৌত্তলিক কৃষ্টি-কালচার শুরু হয়, বিশেষ করে মঙ্গল ঘট স্থাপন ও বিভিন্ন ধরনের পূজা পার্বনে আয়োজন হতে থাকে। এভাবে মুসলিম ঐতিহ্যের বাংলা নববর্ষ মুসলিমদের হাতছাড়া হয়ে পৌত্তলিক কৃষ্টি-কালচার অনুযায়ী পরিচালিত হতে থাকে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা এদেশ থেকে চলে গেলে পূর্ব বাংলার মুসলিম সম্প্রদায় পশ্চিমবাংলার হিন্দু সংস্কৃতি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে মিলিত না হয়ে হাজার মাইল দূরের পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম জনগোষ্ঠী, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি কালচার সাথে একাত্ম ঘোষণা করে। এ কারণে সে সময় বাংলা নববর্ষের নামে পূর্ব বাংলায় পৌত্তলিক সাংস্কৃতি ও কৃষ্টি কালচারের প্রসার ঘটানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আধিপত্যবাদী আগ্রাসন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের কৃষ্টি-কালচারকে পরিত্যাগ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কৃষ্টি-কালচার অনুযায়ী বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়, যা ১৯৭৯ সালে এসে পূর্ণতা লাভ করে।
এদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিকট এই উপমহাদেশে মুসলিম শাসকদের অবদানকে ম্লান করে দেওয়ার জন্যই মূলত বাংলা নববর্ষের সাথে অনইসলামী তথা দেশীয় সংস্কৃতির নামে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের কৃষ্টিকালচারের বিপরীতে সংখ্যালঘু(শতকরা মাত্র ১০ জন)এর কৃষ্টি কালচারকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সবই হচ্ছে আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের প্রথম ধাপ। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য দেশীয় সংস্কৃতি কথা বলে সংখ্যালঘু ১০ জনের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টি কালচারকে বিকশিত করা শুরু হয় ৯০ জন মুসলিমের হাত ধরে। ১৯৭৯ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার আড়ালে বিভিন্ন দেবদেবীর মুখোশ বহন, ধুতি পড়ে কপালে তিলক আঁকা, ঢাক ঢোল কাঁসার বাদ্য বাজনা প্রচলনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় কৃষ্টি কালচারকে ধ্বংস করা শুরু হয়। আর দুঃখজনক ঘটনা হলো মুসলিম সন্তানেরা এটা না বুঝেই আধিপত্যবাদের অদৃশ্য সুতার জালে আবদ্ধ হয়ে দেশীয় সংস্কৃতি ফাঁকা বুলিতে আচ্ছন্ন হয়ে ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পরিবর্তে পৌত্তলিক সংস্কৃতি ও কৃষ্টি-কালচারের বিকাশ সাধন করে চলছে।
বাংলা নববর্ষ দেশীয় সাংস্কৃতির মোড়কে উদযাপন করা হলে এদেশের শতকরা ৯০ জন মুসলিমের ধর্মীয় কৃষ্টি কালচারকে ধারণ করা হয় না কেন। এদেশের শতকরা ৯০ জন মুসলিমের নিজস্ব কৃষ্টি কালচারের কি এতই অভাব হয়েছে যে নিজস্ব কৃষ্টি কালচারকে বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কৃষ্টি কালচারকে দেশীয় সংস্কৃতি বলে গ্রহণ করতে হবে। শতকরা ১০ জন অমুসলিম সম্প্রদায়ের পৌত্তলিক সংস্কৃতি যদি দেশীয় সংস্কৃতি হয় তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ শতকরা ৯০ জন মুসলিমের নিজস্ব কৃষ্টি কালচার আরো বড় দেশীয় সংস্কৃতি হওয়ার কথা। দুঃখজনক হল সংখ্যালঘু দশজনের পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে দেশীয় সংস্কৃতি বলা হচ্ছে তাহলে সংখ্যাগুরু মুসলিমদের সংস্কৃতি কি বিদেশি সংস্কৃতি? তার অর্থ কি এটা নয় যে, মুসলিমরা এদেশের অধিবাসী নয় তাদেরকে বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে এদেশীয় সংস্কৃতি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে না। এজন্যই বোধহয় শতকরা ৯০ জন মুসলিমের দেশে সংখ্যালঘু ১০জনের কৃষ্টি-কালচারকে দেশীয় সংস্কৃতি বলে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে ।
অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, মুসলিম পিতা-মাতার সন্তানেরা, মুসলিম নাম ধারণকারী মেধাবী বুদ্ধিজীবীরা বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য ভুলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কৃষ্টি কালচারকে দেশীয় সংস্কৃতি বলে প্রচার করছে । চৌদ্দ পুরুষের নাড়িপোঁতা দেশে শতকরা ৯০ জন হওয়ার পরও স্বজাতির প্রতি এই হীনমন্যতা দেখিয়ে তারা নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছে। যা তাদের পরবর্তী প্রজন্ম হারে হারে টের পাবে। এভাবেই হয়তো একদিন ব্রিটিশ শাসনামলের মত মুসলিমদের নামের আগে শ্রী বসে যাবে। মুসলিমদের পরিচয় হবে শ্রী মোহাম্মদ —–। নতুন কোন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ শুদ্ধি আন্দোলন শুরু করবে।
ইবনে শাহ
আগারগাঁও ঢাকা
২২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ।