বীর সেনানি ও বাংলার মুকুট: শহীদ ওসমান হাদী
শহীদ ওসমান হাদী—একটি নাম নয়, একটি সাহসী অধ্যায়, একটি সংগ্রামী ইতিহাস। তিনি ছিলেন বাংলার অহংকার, আঠারো কোটি মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন ও মাথার মুকুট। অন্যায়, শোষণ ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে যাঁর কণ্ঠ ছিল আপসহীন, যাঁর পদচারণায় ভয় পেত দুর্নীতিবাজ ও চাঁদাবাজরা। ভারতীয় আধিপত্য ও অন্যায় প্রভাবের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক দৃঢ়চেতা, লড়াকু সৈনিক—যিনি কখনো মাথা নত করেননি, কখনো সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি।
ওসমান হাদীর জীবন ছিল সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির মুক্তি আসে ন্যায় ও সাহসের মধ্য দিয়ে। তাই তিনি মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। সমাজের বুকে জমে থাকা অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ ছিল হুঙ্কার, তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। শোষিত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাহসের প্রতীক, আশার বাতিঘর।
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট ও নির্ভীক। তিনি জানতেন, দুর্নীতি একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, সমাজকে করে তোলে অবক্ষয়ের শিকার। তাই তিনি দুর্নীতিবাজদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর এই নির্ভীকতা, এই সত্যনিষ্ঠা তাঁকে করে তুলেছিল গণমানুষের প্রিয় নেতা, আবার একই সঙ্গে স্বার্থান্বেষী ও স্বৈরশাসকদের জন্য ভয়ের কারণ।
দুঃখজনক হলেও সত্য—এই সাহসী মানুষটিকেই স্বৈরশাসক দ্বারা গঠিত সন্ত্রাসীদের গুলির শিকার হতে হয়েছে। নির্মম হামলায় তিনি আজ দুনিয়ার সফর শেষ করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর এই শাহাদাত শুধু একটি প্রাণহানি নয়, এটি জাতির বিবেককে নাড়া দেওয়া এক গভীর বেদনার নাম। বাংলার আকাশ আজ ভারী, বাতাস আজ শোকস্তব্ধ। প্রতিটি সচেতন হৃদয়ে আজ প্রশ্ন—এমন একজন সাহসী কণ্ঠ কেন এভাবে থেমে যাবে?
কিন্তু ইতিহাস বলে, শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না। ওসমান হাদীর শাহাদাত আমাদের জন্য শুধু শোকের নয়, জাগরণেরও বার্তা। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়ে যায়—ন্যায়ের পথে চলতে গেলে ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে গেলে বিপদ আসবেই। তবুও পিছিয়ে যাওয়া যায় না। তাঁর আদর্শ আজ আমাদের সামনে এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত, এক দীপ্ত আলোকবর্তিকা।
তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজ মুক্ত, বৈষম্যহীন মানবিক সমাজের। যেখানে মানুষ মানুষ হিসেবে মর্যাদা পাবে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে সাহসী ও সংগঠিত। আজ তাঁর অনুপস্থিতিতে সেই স্বপ্ন আরও বেশি দায়িত্ব হয়ে এসেছে আমাদের কাঁধে। শহীদ ওসমান হাদীর আদর্শকে ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে—ন্যায়, মানবিকতা ও সততার পথে।
আজ এই শোকের দিনে আমরা অঙ্গীকার করি—তাঁর রক্তের ঋণ আমরা শোধ করব অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমে। ভয় নয়, সত্যই হবে আমাদের শক্তি। তাঁর ত্যাগ আমাদের প্রেরণা দেবে, তাঁর সংগ্রাম আমাদের পথ দেখাবে।
মহান আল্লাহ তায়ালা শহীদ ওসমান হাদীকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন ও সহযোদ্ধাদের ধৈর্য ধারণের তৌফিক দিন। শহীদ ওসমান হাদী বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে, ইতিহাসের পাতায়—এক বীর সেনানি, বাংলার চিরন্তন মুকুট হয়ে।