ভয়ংকর ভূমিকম্পের আতঙ্কে মহান রবের দিকে ফিরে যাওয়ার হৃদয়কাঁপানো মুহূর্ত
সকাল ১১টার কিছুটা আগে অর্থাত ১০.৩৫ মিনিটের সময়- আমি তখন বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। চারদিক ছিল স্বাভাবিক, শান্ত। কিছুক্ষণ পর হঠাৎই মনে হল—কেমন যেন দুলছে আমার চারপাশ। প্রথমদিকে ভেবেছিলাম, হাইওয়ে রাস্তার পাশে বাসা হওয়ায় হয়তো ভারী কোনো গাড়ি দ্রুতগতিতে চলে গেছে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই কম্পনটা আর সামান্য থাকল না—আস্তে আস্তে তীব্র হয়ে উঠতে লাগল, যেন অদৃশ্য কোনও শক্তি পৃথিবীটাকে তার বুকে ঝাঁকাচ্ছে। তখনই উপলব্ধি হল—এটি গাড়ির কম্পন নয়, এটি ভয়ংকর ভূমিকম্প।
মুহূর্তেই হৃদয়ের ভেতর কেঁপে উঠল অন্যরকম এক অনুভূতি—এ কি তবে আমার শেষ মুহূর্ত? আমি শোয়া অবস্থাতেই সাধ্যমতো প্রস্তুতি নিলাম মহান রবের দরবারে ফিরে যাওয়ার। অন্তর তখন এক অদ্ভুত শান্তি ও আতঙ্কের মিশ্র অনুভূতিতে ডুবেছিল। আমার জিহ্বা শুধু উচ্চারণ করছিল—
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ।”
এটাই যেন ছিল একমাত্র ভরসা, একমাত্র ঢাল। বিল্ডিং কাঁপছে, বিছানা কাঁপছে, ঘরের আসবাবপত্র একের পর এক দুলতে দুলতে পড়ে যাচ্ছে। চতুর্দিকের শব্দে মনে হচ্ছিল—ধ্বংস যেন একদম দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। আমি শুয়ে শুয়েই আকাশের দিকে তাকালাম, অনুভব করলাম আল্লাহর শক্তি, আল্লাহর আধিপত্য। পৃথিবীর কোন চিন্তা তখন আমাকে ঘিরে ধরতে পারেনি—আমাকে গ্রাস করেছিল শুধু এক আল্লাহর একত্বের ঘোষণা। মনে হচ্ছিল—এই তো চলে যাচ্ছি, এই কম্পনের মধ্যেই হয়তো শেষ নিঃশ্বাস।
কম্পন তখনও থামেনি। পুরো পাঁচ মিনিট ধরে পৃথিবীর বুক যেন অস্থির হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি সেকেন্ড মনে হচ্ছিল একেকটি যুগ। তারপর ধীরে ধীরে ভূমিকম্পের তীব্রতা কমতে লাগল। শরীর কাঁপছিল, কিন্তু উঠে দাঁড়ালাম এবং দ্রুত দৌড় দিলাম বাইরে। বাইরে গিয়ে দেখি—মানুষের চোখে আতঙ্কের ছাপ, কান্না, দোয়া, আর হতভম্ব নীরবতা।
শিশুদের আর্তনাদ, বৃদ্ধদের অসহায় চাহনি, নারীদের উদ্বিগ্ন দৌড়, যুবকদের ছুটোছুটি—মনে হচ্ছিল পুরো মানবতা একসাথে কেঁপে উঠেছে। আকাশের পাখিগুলো আতঙ্কে ছুটে বেড়াচ্ছে, হাইওয়ের গাড়িগুলো হঠাৎ থেমে অসহায় দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকের বিল্ডিংগুলো দুলছিল, ছাদে থাকা জিনিসপত্র কাঁপছিল। পৃথিবীর প্রতিটি দিক থেকে যেন একই আহ্বান আসছিল—এ এক কেয়ামতের নমুনা।
একপর্যায়ে সব থেমে যায়। দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে মানুষ একে অপরের দিকে তাকায়। আর তারপর—সব কণ্ঠ মিলিয়ে উচ্চারিত হলো,
“আলহামদুলিল্লাহ… আলহামদুলিল্লাহ… আলহামদুলিল্লাহ।”
এ যেন ফিরে পাওয়া জীবনের ঘোষণা। যেন রক্ষা পাওয়ার আনন্দে মানবতার সমবেত কৃতজ্ঞতা।
আমি মাথা তুলে তাকিয়ে রইলাম আকাশের দিকে। মনে মনে বললাম—
“হে আল্লাহ, তুমি পৃথিবীর সব মানুষকে হেফাজত করো। তুমি আমাদের রক্ষা করো, ক্ষমা করো, সঠিক পথে চালাও। আমীন।”
ভয়ংকর সেই মুহূর্ত যেন চিরদিন মনে গেঁথে রইল—যে মুহূর্ত মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা কত দুর্বল, আর মহান রব কত মহান।