ছোট মেয়ের জন্মদিনে, দু’মেয়েকে উদ্দেশ্য করে প্রবাসী বাবার চিঠি
স্নেহের আমার কলিজা,
আসছালামু আলাইকুম। শুভ জন্মদিন আমার মা।
আজ ২৬ মে ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দ। ঠিক এই তারিখে ২০১৬ সালে উজ্জ্বল সূর্যের আলোটা যখন নিভে নিভে অবস্থা, পশ্চিম আকাশ যখন রক্ত বর্ণ ধারন করছে,ব্যস্ত মানুষ গুলো সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ঘরে ফিরছে,পাখি গুলো আপন সুরে কিচিরমিচির করে নিজ নিজ নীড়ে ছুটছে, প্রকৃতি তার রুপ পরিবর্তন করে সূর্যকে বিদায় দিয়ে সুন্দর একটি চাঁদনী রজনীর অপেক্ষা করছে, এমনি এক শান্তিময় সন্ধ্যায় আমাদের কোলকে আলোকিত করে সুতীব্র চিৎকারের মাধ্যমে আপনার আগমনের বার্তা জানিয়ে দিলেন ধরাপৃষ্ঠে। আলহামদুলিল্লাহ্!
আপনার দাদু,নাজমা দাদু, আপনার মায়য়া আপু, আপনার খুব প্রিয় রাহি আপু এবং ডাক্তার-নার্সরা খুব কাছ থেকে আপনার আগমনকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলো, আর আমি দূর প্রবাস থেকে মনের সকল আবেগ দিয়ে স্রষ্টার নিকট দোয়া করছিলাম আপনার আগমনটা যেন সুস্থ,সুন্দর এবং নিরাপদে হয়। আপনার চাচ্চু, দাদাভাই,ফুপ্পি, বড় আম্মু, নানু এবং আপনার খালামনিরা সহ সকল নিকট আত্মীয়রা আপনার জন্য দোয়া করছিলো, যেন সুস্থ ভাবে ভূপৃষ্ঠে আসেন। আলহামদুলিল্লাহ! ডাক্তার, নার্সদের চেষ্টায় এবং সকলের দোয়ায় আপনার আম্মুর হার না মানা যুদ্ধে পেট চিরে আপনাকে পৃথিবীর আলোর মুখ দেখানো হয়েছে।
চাঁদের মতো সোনামুখটি দেখে সকল দুঃখ, যন্ত্রনা, অপেক্ষার প্রহর মুহূর্তেই উবে গেল কর্পূরের মতো।
আলহামদুলিল্লাহ। আনন্দে অশ্রু চলে এসেছিলো,যদিও আপনার আম্মুর জ্ঞান ফিরতে অনেকটা সময় লেগেছে।
আপনার সামনের দুটি মুক্তার মত চক চক করা দাত দেখে সবাই বলাবলি করছিলো আপনি অনেক ভাগ্যবতী। সত্যিই আপনি অনেক ভাগ্যবতী কারন আপনি খুব ভালো একটা বোন পেয়েছেন,অসাধারণ আম্মু-আব্বু এবং দাদা,দাদু, চাচ্চু,ফুপ্পি,বড় আম্মু,অনন্যা আপু,সায়মন ভাইয়া,তন্ময় ভাইয়া এবং লিমন ভাইয়া সহ অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী পেয়েছেন।
আমার আনিশা মা,
আপনার আম্মুর আল্টাস্নোগ্রাফিতে আপনি আসার আগাম বার্তা পেয়ে অত্যন্ত খুশী মনে ইসলামিক নামের অর্থ সহ সুন্দর নাম খুঁজতে লাগলাম। অসংখ্য নামের মধ্যে ইসরাত রহমান সোমাইয়ার বোন ইশরাক রহমার সোরাইয়া নামটি অধিক পছন্দ হয়। কি নামে ডাকলে যে আমার তৃপ্ততা আসবে ভেবে পাচ্ছিলাম না, তাই আবেগে ইশরাক রহমান সোরাইয়া নামটিই নিবন্ধন করে নেই। এদিকে আপনার ফুপ্পি এবং সায়মন ভাইয়া আনিশা নামটি পছন্দ করে, যা এখন সকলের মুখে মুখে। আমার বিশ্বাস শুধু নাম দিয়ে নয় আপনারা গুনগত মানের লেখাপড়া এবং সৎ চরিত্রবান হয়ে, কাজের মাধ্যমে জীবনকে উজ্জ্বল করবেন।
আমার সোরাইয়া,
হাটি হাটি পা করে আজ ৮ বছরে পদার্পণ করলেন। আলহামদুলিল্লাহ্! সব কিছুই যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। এইতো সেদিন আপনার আম্মু আপনাকে পেটে নিয়ে হাঁটছে, ঘুরছে, ডাক্তার দেখাচ্ছে, সংসারের যাবতীয় কাজ করছে, ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছুই যেন আমার চোখের সামনে দিব্যি ভেসে উঠছে। সত্যি সময়ের উপর কারো হাত নেই। সময় বোধ হয় এভাবেই “বহিয়া’ যায়—
আজকের এই বিশেষ দিনে আপনাদের জন্য আব্বুর কিছু উপদেশ –
★ আপনারা দু’জনই পবিত্র কোরআন অনেক সুন্দর এবং শুদ্ধ করে পড়তে পারেন, আলহামদুলিল্লাহ! এতে আমি মুগ্ধ এবং গর্বিত। সূরা লোকমান এর ১৩ থেকে ১৯ পর্যন্ত আয়াতগুলো খুব মনযোগ দিয়ে অর্থ সহ কয়েক বার পড়বেন। হযরত লোকমান (আ:) তাঁর প্রিয় সন্তানকে যে উপদেশগুলো দিয়েছেন তা জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রয়োগ করার চেষ্টা করবেন।♦
★ যত বড় সফল মানুষই হন,ধর্মীয় অনুভূতি না থাকলে এর কোন মূল্য থাকবেনা। খুব বিনয়ের সাথে বলবো – ধর্মীয় মূল্যবোধকে বেশি প্রাধান্য দিবেন। আল্লাহ এবং রাসূল (সা:) এর দেখানো পথ সবসময় অনুসরণ করবেন,তা হলে দোনিয়া এবং আখিরাত দু’জায়গাতেই সফল হবেন,ইনশাআল্লাহ্।♦
★ যারা আপনাদের প্রতি সদয় না, তাঁদের উপর অসন্তোষ পুষে রাখবেন না। কারন, আপনাদের আম্মু এবং আমি ছাড়া, আপনাদের প্রতি সুবিচার করা কারো দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা। আর যারা আপনাদের প্রতি সদয় হয় এবং ভালো ব্যবহার করে – আপনাদের উচিত সেটার সঠিক মূল্যায়ন করা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। একজন মানুষ আজ আপনাদের সাথে ভালো- তার মানে এই নয় যে সে সবসময়ই ভালো থাকবে। কাজেই খুব দ্রুত কাউকে প্রকৃত বন্ধু ভাববেন না। ♦
★ জীবনে কিছুই কিংবা কেউই “অপরিহার্য” নয়, যা আপনাদেরকে পেতেই হবে। একবার যখন আপনারা এ কথাটির গভীরতা অনুধাবন করবেন, তখন জীবনের পথ চলা অনেক সহজ হবে – বিশেষ করে যখন বহুল প্রত্যাশিত কিছু হারাবেন, কিংবা আপনাদেন তথাকথিত আত্মীয়-স্বজনকে আপনাদের পাশে পাবেন না। ♦
★ জীবন সংক্ষিপ্ত।
আজ আপনারা জীবনকে অবহেলা করলে, কাল জীবন আপনাদেরকে ছেড়ে চলে যাবে। কাজেই জীবনকে আপনারা যতো তাড়াতাড়ি মূল্যায়ন করতে শিখবেন, ততোই বেশী উপভোগ করতে পারবেন। ♦
★ ভালবাসা একটি ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি ছাড়া কিছুই নয়। মানুষের মেজাজ আর সময়ের সাথে সাথে এই অনুভূতি বিবর্ণ হবে। যদি আপনাদের তথাকথিত কাছের মানুষ আপনাদেরকে ছেড়ে চলে যায়, ধৈর্য ধরোন, সময় আপনাদের সব ব্যথা-বিষন্নতা কে ধুয়ে-মুছে দেবে। কখনো প্রেম-ভালবাসার মিষ্টতা এবং সৌন্দর্যকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেন না, আবার ভালবাসা হারিয়ে বিষণ্ণতায়ও অতিরঞ্জিত হবেন না।♦
★ অনেক সফল লোক আছেন যাদের হয়তো উচ্চশিক্ষা ছিলনা- এর অর্থ এই নয় যে আপনারাও কঠোর পরিশ্রম বা শিক্ষালাভ ছাড়াই সফল হতে পারবেন! আপনারা যতোটুকু জ্ঞানই অর্জন করোননা কেন, তাই হলো আপনাদের জীবনের অস্ত্র। কেউ ছেঁড়া কাঁথা থেকে লাখ টাকার অধিকারী হতেই পারে, তবে এজন্য তাকে অবশ্যই পরিশ্রম করতে হবে।♦
★ কখনো না বলবেন না, কখনো বলবে না আমি করতে পারবো না। আপনারা অনন্ত এবং সব শক্তি আপনাদের ভিতরে আছে, আপনারা সব কিছুই করতে পারবেন এই চ্যালেঞ্জটা নিজেই নিজের প্রতি রাখবেন।
★ যে কোন বিষয় সহজ ভাবে নিবেন (এই বাক্যটা আপনার আম্মুকে প্রায়ই বলে থাকি) এবং কোন সিদ্ধান্তই হুট করে নিবেন না, আম্মু- আব্বুর পরামর্শ ছারা। বাবা- মা থেকে বন্ধুদের পরামর্শকে কখনো অধিক গুরুত্ব দিবেন না। ♦
★ আপনারা আপনাদের কথার মর্যাদা রাখবেন, কিন্তু অন্যদের কাছে তা আশা করবেন না। মানুষের সাথে ভালো আচরন করবেন, তবে অন্যরাও আপনাদের সাথে ভালো আচরন করবে- তা প্রত্যাশা করবেন না। স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস রাখবেন, পৃথিবীর কার কাছ থেকে কি পেলেন তা নিয়ে ভাববেন না, সততার পুরষ্কার আল্লাহ দিয়ে থাকেন। ♦
★ জীবনে কখনও কোনো কিছুতেই লোভ করবেন না। লোভ খুব খারাপ জিনিস। আপনাদের জীবন থেকে লোভ সম্পূর্ন ত্যাগ করবেন। আপনাদের হাতের কাছে যদি হীরা, মনিমুক্তা, জহরত থাকে আপনারা ছুঁয়েও দেখবেন না। যে জিনিস আপনাদের না সেটা ধরবেন না। কেউ যদি লোভ দেখায় তার কথায় ভুলবেন না। যারা লোভ দেখাবে তাঁরা দুষ্টলোক। দুষ্টলোক থেকে সব সময় দূরে থাকবেন। আপনাদের ২৪/২৫ বছর বয়স পর্যন্ত একটাই কাজ থাকবে, শুধু লেখাপড়া আর লেখাপড়া । প্রচুর পড়াশোনা করবেন। আপনাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং শক্তি হবে লেখাপড়া। লেখাপড়ার কোনো বিকল্প নেই। যখন আপনারা লেখাপড়া করে জ্ঞান সঞ্চয় করবেন, তখন আপনাদেরকে কেউ ঠকাতে পারবে না। কাজেই সব কিছুর আগে লেখাপড়াকে গুরুত্ব দিবেন খুব বেশি।♦
★ দুনিয়াতে কোনো কিছুই আপনাদের মনের মতো হবে না। আপনারা আপনাদের জ্ঞান দিয়ে, পরিশ্রম দিয়ে সব কিছু আপনাদের মনের মতোন করে বানিয়ে নিবেন। এজন্য কারো সাহায্য কামনা করবেন না। আপনাদের ক্ষুধা পেলে আপনাদেকেই রান্না করে খেতে হবে। কেউ আপনাদেকে মুখে তুলে খাইয়ে দিবে না। আল্লাহ ছারা দুনিয়াতে কারো কাছে কিছু আশা করবেন না। যা করার আপনাদেরকেই করতে হবে। প্রচুর পরিশ্রম করলে আপনারা সাফল্য পাবেনই। সাফল্য না পাওয়া পর্যন্ত পরিশ্রম করে যাবেন। যখন আপনারা অনেক জ্ঞান সঞ্চয় করবেন, তখন কোনো কুসংস্কার আপনাদেরকে আঁকড়ে ধরতে পারবে না। দুনিয়াতে সবচেয়ে বড় সম্পদ জ্ঞান। তাই শুধু জ্ঞান সংগ্রহ করে যান। নিজের স্বচ্ছ পবিত্র জ্ঞান দিয়ে আপনারা মানুষের উপকার করে যাবেন। আপনারা মানুষের বিপদে পাশে থাকলে, মানুষও আপনাদের বিপদে পাশে থাকবে।♦
★ আপনাদের সাথে আমি কতোটা সময় ছিলাম বা থাকবো – সেটা কোন ব্যাপার না। বরং চলেন আমরা আমাদের একসাথে কাটানো মুহুর্তগুলো সুন্দর ভাবে উপভোগ করি …মূল্যায়ন করি। ♦
——————
ভালোবাসা সহ,
আপনাদের আব্বু…..
আজমান, আরব আমিরাত।
রাত্র ১২.১ মিনিট (বাংলাদেশ সময়)