যুবক আদম আঃ এর সঙ্গী রূপে পুরুষ না হয়ে নারী কেন সৃষ্টি করা হলো —
পৃথিবীর উপাদান অর্থাৎ মাটি থেকে সৃষ্টি করা যুবক আদমকে প্রাথমিকভাবে স্বর্গীয় উদ্যানে রাখা হয়েছিল । যুবক আদম চোখ মেলে অবাক হয়ে আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য দেখতে থাকেন। বেহেস্তের অপূর্ব নাজ নেয়ামত ঝর্ণা গাছপালা পশুপাখি তরুলতা সমৃদ্ধ সুশোভিত উদ্যান। যুব আদম একা ছিলেন , সম্পন্ন একা কারণ মানবজাতির অংশ হিসেবে সর্বপ্রথম তাকেই সৃষ্টি করা হয়। তার কথা বলার কোন সঙ্গী সাথী ছিল না, মনের ভাব প্রকাশের কেউ ছিলনা। একাকীত্ব বিষন্নতা যুবক আদমের মনে বাসা বাঁধে।
মহান সৃষ্টিকর্তা যুবক আদম আঃ এর একাকীত্ব বিষন্নতা মনের ইচ্ছা অনুভূতি চাওয়া পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আদমের শরীরের একটি অঙ্গ থেকে একজন নারী সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি হলেন আমাদের আদি মাতা হযরত হাওয়া (আঃ)।
মানুষ স্বভাবতই আবেগ প্রবণ। নিঃসঙ্গতা মানুষের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। তাই আল্লাহ এমন একটি সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন যা স্থায়ী ঘনিষ্ঠ পারস্পরিক নির্ভরশীল। জান্নাতে অবস্থান করলেও তাঁর জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করা হয়, যা মানুষের অন্তর্নিহিত সঙ্গপ্রয়োজনের প্রমাণ বহন করে।
এখানে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক আদম আঃ এর একাকীত্ব বিষন্নতা বা সঙ্গীর প্রয়োজনে মহান সৃষ্টিকর্তা নারীকে কেন সৃষ্টি করলেন। বরং আদম আঃ এর বন্ধুরূপে সাথীরূপে আর দু একজন পুরুষ সাথী সৃষ্টি করে দিতে পারতেন। আল্লাহ কেন আদম (আ.)-এর জন্য একজন স্ত্রী সৃষ্টি করলেন—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু এতটুকু বলা যায় যে, সম্ভবত যুবক আদম আঃ যখন চোখ মেলে বেহেস্তের নাজ নেয়ামত দেখতে ছিলেন, স্বর্গীয় উদ্যান বিচিত্র রকমের গাছ-গাছালি, ফুল ফল, পশুপাখি, কী পতঙ্গ প্রত্যেককে জোড়া জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে। পাখিরা জোড়ায় জোড়ায় অবস্থান করে নিজেদের মনের ভাব আদান প্রদান করছে, একে অপরকে আদর সোহাগে ভরিয়ে দিচ্ছে, প্রজনন ঘটছে ডিম ফুটাচ্ছে বাচ্চা দিচ্ছে বাচ্চা লালন পালন করছে।
পশুরাও জোড়ায় জোড়ায় মিলিত হয়েছে গর্ভধারণ করছে বাচ্চা প্রসব করছে । স্বর্গীয় উদ্যানের বিভিন্ন প্রকার গাছের ফুল ফুলের রেনু একে অপরের সাথে মিলিত হয়ে সংস্পর্শে এসে গর্ভাশয় নিসিক্ত হওয়ার পরে ফলে রূপান্তর হচ্ছে।
মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি এসব দৃশ্য দেখে একাকী যুবকের মনে ঠিক তেমন একজন সঙ্গিনীর আকাঙ্খাই ফুটে ওঠে। স্বর্গীয় উদ্যানে কপোত কপোতির প্রেমালিঙ্গন, বিভিন্ন প্রাণীর প্রজনন প্রক্রিয়া, বংশবিস্তার যুবক আদমের মনে এক নিঃসঙ্গতার উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। সেই আবেগ অনুভূতি প্রেরণা কোন বন্ধু বান্ধব বা যুবক-সাথীর ছিল না, কামনা বাসনা জেগেছিল অন্যান্য সৃষ্টি কুল যেমন জোড়ায় জোড়ায় মিলে ছিল, ঠিক তেমনি এক জোড়া হওয়ার। যুবক আছে যুবতীর প্রয়োজন, তাইতো যুবক আদমের মনের ভাব ভালবাসা, আদরস্নেহ প্রেম নিবেদন করার জন্য সঙ্গিনীর অভাব অনুভূত হতে থাকে।
এরই ভাবার্থ কোরআন ও হাদিসে ফুটে উঠেছে, কুরআনে বলা হয়েছে,
“তিনি তোমাদেরকে একটি সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা আল-আরাফ ৭:১৮৯)
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত,
“আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও; এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।” (সূরা আর-রূম ৩০:২১)
এই আয়াতগুলো থেকে তিনটি মৌলিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়
সাকীনাহ (প্রশান্তি)-
প্রশান্তি, স্থিরতা, মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি। এটি এমন এক গভীর শান্তি, যা শুধু বাহ্যিক নীরবতা নয়, বরং অন্তরের ভেতরের স্থিরতা ও তৃপ্তি। সহজভাবে বোঝালে সাকিনাহ হলো এমন অবস্থা যখন মন অস্থির না থেকে স্থির থাকে দুশ্চিন্তার মাঝেও এক ধরনের ভরসা কাজ করে হৃদয়ে এক গভীর শান্তি অনুভূত হয়। শারীরিক ও মানসিক স্থিতি প্রদান করে, অস্থিরতা ও আবেগ প্রশমিত করে, সুস্থ চিন্তা চেতনার আলোকে শরীরকে কর্ম সম্পাদনে জন্য প্রস্তুত রাখে।
মাওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা),
আবেগিক বন্ধন একে অপরের প্রতি তীব্র ভালো লাগা, পছন্দনীয়, মনোযোগ আকর্ষণ অনুভব করা। ভালোবাসা মানুষের এক গভীর ও জটিল অনুভূতি—এটা শুধু কারো প্রতি আকর্ষণ নয়, বরং যত্ন, মমতা, বিশ্বাস, এবং একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতার সমন্বয়। সহজভাবে বলতে গেলে: ভালোবাসা হলো—কারো সুখে নিজের সুখ খুঁজে পাওয়া, তার কষ্টে কষ্ট পাওয়া, তাকে সম্মান করা এবং তার পাশে থাকা, তার ভালো-মন্দ সব দিক মেনে নেওয়া
রহমাহ (দয়া),
পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহানুভূতি অতএব, নারী সৃষ্টি শুধুমাত্র সঙ্গ দেওয়ার জন্য নয়, বরং একটি গভীর মানবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য একে অন্যের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা, প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসা, দুঃখ কষ্টে শুধু দুঃখী হওয়া নয়, দুঃখ কষ্ট লাগাবের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা।
সৃষ্টিগতভাবে পুরুষ ও নারী একে অপরের “পরিপূরক” । কুরআনে বলা হয়েছে: “তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৭)।
এই উপমা নির্দেশ করে পারস্পরিক সুরক্ষা নৈতিক সংযম গোপনীয়তা রক্ষা সৌন্দর্য বৃদ্ধি
অতএব, নারী এর সৃষ্টি মানবজীবনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার অংশ।
এ কারণেই সৃষ্টিকর্তা যুবক আদমের একাকীত্ব ঘোষণার জন্য যুবক বন্ধু সাথী সৃষ্টি না করে যুবতী মাতা হাওয়া কে সৃষ্টি করেছিলেন। মানবজাতির বিস্তারের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য প্রজনন অপরিহার্য। আল্লাহ আদম আঃ এর জন্য সঙ্গিনী স্ত্রী সৃষ্টি করে মানব বংশবিস্তারকে বৈধ ও সংগঠিত রূপ দেন।
বন্ধুত্ব বা অন্যান্য সম্পর্ক মানবজাতির বিস্তার ঘটাতে পারে না। কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্কের মাধ্যমে পরিবার গঠিত হয় সন্তান জন্ম নেয় সমাজ ও সভ্যতার ভিত্তি স্থাপিত হয়। ইসলামী সমাজব্যবস্থায় পরিবার একটি মৌলিক প্রতিষ্ঠান, যার সূচনা যুবক আদম (আ.) ও যূবতী মাতা হাওয়া (আ.) থেকে। সেই পরিবার প্রথা আজও মানব সমাজের টিকে আছে, যেটার শুরু করেছিলেন আমাদের আদি পিতা মাতা।
– ইবনে শাহ রচিত – হে যুবক ! এড্রেসিং ইউ, গ্রন্থ থেকে